একসঙ্গে আন্দোলন ও নির্বাচনের প্রস্তুতি বিএনপির

রাজনৈতিক ডেক্স:
নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায়কেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি। তবে এ লক্ষ্যে গড়ে ওঠা আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতিও চলছে। এজন্য দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা না থাকলেও ভেতরে ভেতরে কাজ শুরু করেছে হাইকমান্ড।

দলটির নেতারা বলছেন, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার বিষয়ে তাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত আছে। এজন্য তারা নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায়ে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। সব দলকে ঐক্যবদ্ধ করে এবার অলআউট মাঠে নামতে চায় তারা।

এর আগে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি, গ্যাস ও পানির দাম বাড়ানোর উদ্যোগের প্রতিবাদে শিগগিরই কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী নির্বাচন সামনে রেখে প্রতিটি সংসদীয় আসনে সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকা তৈরি করছে হাইকমান্ড। এখন থেকেই তাদের দলীয় কর্মসূচি পালনসহ নানা ইস্যুতে নিজ নিজ এলাকায় থাকার মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন তারা। আগামী নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন।

আন্দোলন ও নির্বাচনকে সামনে রেখে পুরোদমে চলছে দল গোছানোর কাজ। ইতোমধ্যে ৮১টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ৫২টির পুনর্গঠন শেষ হয়েছে। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে দ্রুত সময়ে বাকিগুলোর কাজ শেষ করা হবে। দলের পাশাপাশি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোও ঢেলে সাজানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে কৃষক দল ও জাসাসের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।

দ্রুতই পুনর্গঠন করা হবে ছাত্রদল, যুবদল, মহিলা দল ও স্বেচ্ছাসেবক দল। অঙ্গসংগঠনগুলো মহানগরসহ বিভিন্ন ইউনিটের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠন করছে। ঢাকা মহানগরকে আন্দোলন ও নির্বাচনমুখী করতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দুই সিটির আহ্বায়ক কমিটি প্রতিটি থানা ও ওয়ার্ড কমিটিতে নতুন নেতৃত্ব আনতে কাজ করছে।

জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপি একটি নির্বাচনমুখী দল। যে কোনো পরিস্থিতিতে নির্বাচনে যাওয়ার মতো প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে। তবে আমরা চাই সেই নির্বাচনটা হবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। এই মুহূর্তে আমাদের একমাত্র চাওয়া হচ্ছে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার। শুধু বিএনপি নয়, দেশের প্রতিটি মানুষের চাওয়াও তাই। সে লক্ষ্যে আমরা বৃহত্তর ঐক্যের উদ্যোগ নিয়েছি। সরকার স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করলে রাজপথের আন্দোলনের মধ্য দিয়েই নিরপেক্ষ সরকারের দাবি প্রতিষ্ঠা করা হবে।

নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিয়েছে বিএনপি। এ লক্ষ্যে ২০ দলীয় জোট, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের সঙ্গে দফায় দফায় অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।

বুধবার গুলশান কার্যালয়ে জোটের শরিক কল্যাণ পার্টি, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) ও ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ সময় ২০ দলের সমন্বয়ক বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানও উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে জোটের ৯ শরিকের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেন স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। এসব বৈঠকে বৃহত্তর ঐক্যের ব্যাপারে শরিকদের মতামত নেওয়া হচ্ছে। তাদের কোনো চাওয়া-পাওয়া রয়েছে কিনা তাও জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বৃহত্তর ঐক্যের ব্যাপারে জামায়াতের ভূমিকা কী হবে সেটা নিয়েও ভাবছে দলটির নেতারা। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের সঙ্গে কথা বলতে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনসহ কয়েকজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আগামী সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে এদের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

পাশাপাশি সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠক করছে বিএনপি। এসব দলগুলোর সঙ্গে শিগগিরই আনুষ্ঠানিক বৈঠক হবে বলে জানা গেছে। এরপরই বৃহত্তর ঐক্যের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। সব দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে একটি রূপরেখা তুলে ধরবে বিএনপি। সেই আলোকেই হবে আন্দোলন।

দলটির নীতিনির্ধাকরা জানান, আগামী নির্বাচন যে প্রক্রিয়ায় হোক সেজন্য দলের প্রস্তুতি প্রয়োজন রয়েছে। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায়ের পাশাপাশি ভেতরে ভেতরে চলছে সেই প্রস্তুতি। দল গোছানোর পাশাপাশি ৩শ আসনে প্রাথমিক মনোনয়ন চূড়ান্তে গোপনে চলছে কাজ। দলের হাইকমান্ড নানা মাধ্যমে খোঁজখবর নিয়ে প্রতি আসনে দুজন করে সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই করছেন।

তবে স্থায়ী কমিটির সদস্য ও দলের সিনিয়র কয়েক নেতার আসনকে এ প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সিনিয়র নেতাদের কেউ যদি নির্বাচন করতে আগ্রহ প্রকাশ না করে সেক্ষেত্রে ওইসব আসনে বিকল্প প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। এছাড়া দল গোছানোর প্রক্রিয়াতেও রয়েছে নির্বাচনি প্রস্তুতি। আগামী নির্বাচনে যাদের দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে তাদের জেলা ও মহানগরের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

যারা নির্বাচন করতে আগ্রহী তাদের ভোটের মাঠ গোছাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যারা মনোনয়নপ্রত্যাশী তারা দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছে কিনা তা মনিটরিং করা হচ্ছে। আন্দোলনে রাজপথে না থাকলে মনোনয়ন দেওয়া হবে না বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। হাইকমান্ডের এমন মনোভাব বুঝতে পেরে সম্ভাব্য প্রার্থীরা দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। প্রমাণ হিসাবে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, বর্তমান সরকারের অধীনে দেশে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয় তা প্রমাণিত। তাই এ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন এ দেশে হবে না। নির্বাচন যে একটা উৎসব সেটা দেশের মানুষ ভুলে যাচ্ছে। আমরা চাই নির্বাচনকালীন একটি নিরপেক্ষ সরকার। এ দাবিতে আমরা আন্দোলন করছি। আগামীতে সবাইকে নিয়ে এ আন্দোলন আরও জোরদার করা হবে।

তিনি বলেন, বিএনপি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক একটি দল। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলে আমরা বিশ্বাস করি। আমাদের সব সময় নির্বাচনের প্রস্তুতি রয়েছে। তবে সে নির্বাচন হতে হবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে।