লকডাউনের সপ্তাহে রেকর্ড সংক্রমণ ও মৃত্যুর খবর: করোনাভাইরাসের

গতবছর ৮ মার্চ দেশে করোনাভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ার পর এক সপ্তাহে শনাক্ত নতুন রোগী এবং মৃত্যুর সর্বোচ্চ সংখ্যা এটি।
মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে দেশে সংক্রমণ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক দিকে মোড় নেওয়ায় ৫ এপ্রিল ভোর ৬টা থেকে ১১ এপ্রিলে রাত ১২টা পর্যন্ত প্রথম দফা লকডাউনের বিধিনিষেধ জারি করা হয়।
এরপর জনদাবির মুখে কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করা হলেও ১৪ এপ্রিল ভোর ৬টা থেকে ২১ এপ্রিল রাত ১২টা পর্যন্ত নতুন করে ‘কঠোর’ লকডাউন জারি করা হয়েছে।
এর মধ্যে প্রথম দফার লকডাউনের শেষ দিনে ১১ এপ্রিল সকাল ৮টা থেকে ১২ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা এ যাবৎ সর্বাধিক। এক দিনে শনাক্ত হয়েছে আরও ৭ হাজার ২০১ জন রোগী।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অবশ্য দেশের গত এক সপ্তাহের পরিস্থিতিকে ‘লকডাউন’ মানতে নারাজ। তারা বলছেন, বিধিনিষেধ যা জারি হয়েছিল, তার সবকিছুই শিথিল ছিল।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, “বাস্তবিক অর্থে এটা কোনো লকডাউন হয়নি। কয়েকটা গাড়ি কয়েকদিন বন্ধ ছিল, এইত। রাস্তায় জনসমাগম, দোকানপাট, বাজার, অফিস সবই খোলা রাখা হয়েছে। এটা কোনো লকডাউন হয়নি।”

সংক্রমণে লাগাম দিতে লকডাউনের বিধিনিষেধের সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মানা নিশ্চিতে ‘কড়া পদক্ষেপ’ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
তবে লকডাউনের সুফল পেতে আরও দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন।

আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান এই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, “এই লকডাউনের ফল পেতে আপনাকে দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে। করোনাভাইরাসের শক্তিকাল হচ্ছে দুই সপ্তাহ। এখন যে সংক্রমণ বেড়ে গেল, সেটা কিন্তু দুই সপ্তাহ আগের।
“এখন যে মৃত্যু বাড়ছে, সেটা কিন্তু তিন সপ্তাহ আগের। তো আরও এক সপ্তাহ যাওয়ার পর সংক্রমণের প্রবাহটা জানতে পারব আমরা। আর মৃত্যুর প্রবাহটা জানতে পারব আরও দুই সপ্তাহ পরে।”
গত বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়। এরপর ‘সাধারণ ছুটি’ নামে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করে সংক্রমণ ঠেকানোর চেষ্টা করে সরকার।

চলতি বছরে মার্চের মাঝামাঝি ফের সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। প্রায় প্রতিদিনই আক্রান্ত আর মৃত্যুর সংখ্যায় নতুন রেকর্ডের খবর আসতে থাকে।
মার্চের মাঝামাঝি সময়ে যেখানে দৈনিক মৃত্যু ২০ জনের নিচে ছিল, ৩১ মার্চ তা ৫০ ছাড়িয়ে যায়। এরপর তা আর ৫০ এর নিচে নামেনি, বরং সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আগের এক দিনে রেকর্ড ৮৩ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে।
গত এক সপ্তাহে মারা যাওয়া ৫০৪ জনের মধ্যে ৩০৭ জনের, অর্থাৎ ৬১ শতাংশের বয়স ছিল ৬০ বছরের বেশি। তাদের ৩৩২ জন, অর্থাৎ ৫৫ শতাংশ ছিলেন ঢাকা বিভাগের বাসিন্দা।

গত ২৯ মার্চ দেশে প্রথমবারের দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এরপর তা আর পাঁচ হাজারের নিচে নামেনি। এর মধ্যে ৭ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আগের এক দিনে রেকর্ড ৭ হাজার ৬২৬ জন নতুন রোগী শনাক্তের খবর দিয়েছে।

আইসিডিডিআর,বির এক গবেষণলা বলছে, গতবছরের শেষ ভাগে করোনাভাইরাসের যে নতুন ধরনটি দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথমবার শনাক্ত হয়েছিল, অতি সংক্রামক সেই ধরনটিই এখন বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি সক্রিয়।
দেশে সংক্রমণের গতিপ্রকৃতি কোন দিকে যাচ্ছে- এ প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, “এখন দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। শনাক্তের হারও একই রকম। অনেক সময় দেখা যায়, পিকে উঠে কয়েকদিন থাকে। তারপর যখন কমতে থাকে, তখন আমরা বলতে পারব এটা কেমন ছিল।”

তার মতে, পরিস্থিতি যাতে আরও খারাপের দিকে না যায়, সেজন্য ‘একেবারে কার্ফুর মত লকডাউন’ দেওয়া দরকার।
“এমনভাবে লকডাউন দিতে হবে, যাতে মানুষজন বাসার বাইরে বের হতে না পারে। একেবারে কার্ফু যাকে বলে, সেভাবে লকডাউন দিতে। সাধারণ মানুষের চলাচল, যোগাযোগ বন্ধ না করে লকডাউন দিলে কোনো লাভ হবে না।”
ডা. আবদুল্লাহ বলেন, জনসমাগম যত বেশি হবে, করোনাভাইরাস তত ছড়াবে। মাঝখানে স্বাস্থ্যবিধি না মানায় পরিস্থিতি এখনকার পর্যায়ে এসেছে।

আর মহামারী প্রতিরোধে সরকারকে পরামর্শ দিয়ে আসা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, লকডাউনের মত বিধিনিষেধ জারি হলেও তাতে জনগণকে সম্পৃক্ত করার কাজটা হচ্ছে না।
“ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়ররা তো কোনো সমন্বয় কমিটি করেননি। জনগণকে সম্পৃক্ত করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এলাকা ভিত্তিক ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে, তাহলে অবস্থার উন্নতি হবে।”

করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে গতবছর ওয়ারী ও টোলারবাগ লকডাউনের উদাহরণ টেনে মুশতাক বলেন, “যতই কড়া আইন আপনি করেন, মানুষকে সহায়তা না করলে সে সেটা মানবে না। এলাকার মানুষকে সম্পৃক্ত করে এলাকাভিত্তিক লকডাউন দিতে হবে। আর এতে স্থানীয় এমপি, কাউন্সিলরসহ জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।”