বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে উদ্যোগী:মেয়েরাও

বরগুনা জেলার ৬ নম্বর বুড়িরচর গ্রামের বীথি আক্তার। নবম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় তার মতামত না নিয়েই পারিবারিকভাবে বিয়ে ঠিক করা হয়। এমনকি বন্ধ করে দেওয়া হয় স্কুলে যাওয়াও। কিন্তু তার প্রতিবাদের মুখে বন্ধ হয় বিয়ে। বীথি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি এখন আত্মবিশ্বাসী। আগে যে বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতাম না, এখন বয়ঃসন্ধিকাল, বাল্যবিয়ে, জেন্ডার বৈষম্য, একতা, পরিবার পরিকল্পনা, যৌনরোগ, প্রজনন স্বাস্থ্য, যৌনরোগ প্রতিরোধের কৌশল, কিশোরী বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি ইত্যাদি বিষয়ে জেনেছি। শুধু তাই নয়, গ্রামে তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে সমবয়সীদের সঙ্গে নিয়ে সচেতনতামূলক কাজ করছি।’ এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের ২৯ মার্চ গ্রামের হিন্দুপাড়ার ঝন্টুর মেয়ে ১৮ বছরের কম বয়সী সেতুর বিয়ে ও একই গ্রামের কানন চন্দ্র শীলের মেয়ে চম্পার বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে সক্ষম হন বীথি ও তার বন্ধুরা। তবে এ কাজে তাদের সহযোগিতা করেছিলেন ইউপি চেয়ারম্যান মো. সিদ্দিকুর রহমান।

সাজেদার ঘটনাও ছিল একই রকম। বুড়িরচর ইউনিয়নের মহিঠা গ্রামের সানু মিয়ার মেয়ে সাজেদা। বাবা দিনমজুর হওয়ায় ১৪ বছর বয়সেই বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তাকে। কিন্তু মেয়ের প্রতিবাদের মুখে এ বিয়ে বন্ধ করতে বাধ্য হন সানু মিয়া। বর্তমানে ডিগ্রি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সাজেদা বলেন, ‘বাল্যবিয়ে হওয়ার কারণে আমার বড় বোন প্রায় সময়ই অসুস্থ থাকতেন। যখন আমি বুঝতে পারি বাল্যবিয়েই এর অন্যতম কারণ, তখনই শুরু হয় এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম। বোনের এই করুণ পরিস্থিতি দেখেও আমার বাবা থেমে থাকেননি। আমাকে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে স্কুলের শিক্ষকসহ অন্যদের সহযোগিতায় বিয়ে বন্ধ করতে সক্ষম হই।’

শিশু অধিকার নিয়ে যারা কাজ করছেন, সেসব সংগঠনের নেতারা জানান, বাল্যবিয়ে ছেলেমেয়ে উভয়েরই মানবাধিকার লঙ্ঘন করে। এর পরিণতিতে শুধু তারাই নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো পরিবার। প্রথম শিকার হয় শিশু, দ্বিতীয় শিকার নারী এবং তৃতীয় শিকার সমাজ।

মেয়েদের বিয়ের বয়স নির্ধারণে বিভিন্ন আন্দোলনের ফলে মেয়েরা এখন অনেক বেশি সচেতন হয়েছে। অভিভাবক, এলাকাবাসীর ওপর নির্ভর না করে কিশোরী মেয়েরা তাদের বন্ধুদের সহায়তায় নিজেরাই বাল্যবিয়ে বন্ধ করছে।

অনেক সময় মেয়েরা নিজেরা উদ্যোগী হয়েও বাল্যবিয়ে বন্ধ করছে। এতে করে মেয়েদের মধ্যে এক ধরনের সচেতনতা ও সাহস বেড়েছে এবং মেয়েরাও যে পারে ওই আত্মবিশ্বাসটাও এসেছে। এই খবরগুলো যখন প্রচার হয় তখন অন্যান্য অঞ্চলের ছেলে মেয়েরাও বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে উদ্যোগী হয়।

ইউনিসেফের এক জরিপে দেখা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশে বাল্যবিয়ে বন্ধে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। ২০০০ সালের প্রথম দিকে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার ছিল ৬৮ শতাংশ। ২০১১ সালে এই হার ৬৫ শতাংশে নেমে আসে।

২০১৩ সালের মাল্টিপল ইনডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে অনুযায়ী বাংলাদেশে শিশু বিয়ের হার ছিল ৫২ শতাংশ। ২০১৬ সালে পরিসংখ্যান ব্যুরো, আইএমইডি ও ইউনিসেফের সামাজিক সেবা সম্পর্কিত এক যৌথ সমীক্ষায় দেখা যায়, ২ লাখ পরিবারের মাত্র ৩৫ শতাংশ ২০-২৪ বছর বয়সী মেয়ের ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয়েছিল।

বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। মেয়েরাও সচেতন হয়েছে। বাল্যবিয়ে বন্ধ করছে তারা নিজেরাই। সচেতনতা বাড়াতে মাঠ পর্যায়ে সরকারি ও বেসরকারি বেশ কিছু কার্যক্রম চলছে।

এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে জনগণ আরও বেশি সচেতন হবে। মেয়েরাও সাহসী হয়ে উঠবে। বিশিষ্টজন বলছেন, মাল্টি-মিডিয়া প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বাল্যবিয়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে লোকজনকে জানাতে এবং এতে সম্পৃক্ত হতে উৎসাহিত করার মাধ্যমে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার মাধ্যমে বাল্যবিয়ে বন্ধ করা সম্ভব।

বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের অবস্থা সম্পর্কে জানতে ২০১৮ সালে জরিপের কাজ শুরু করে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা ওই জরিপের তথ্য অনুযায়ী দেশে বাল্যবিয়ের হার ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ। গ্রামে এ হার ৫৪ শতাংশ। আর শহরে ৪৪ শতাংশ।

নারীপক্ষের সদস্য সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘বাল্যবিয়ে রুখতে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেও এখনও কমছে না। অপরিণত বয়সে বিয়ে যে ছেলেমেয়েদের জীবন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস করে, এ বিষয়ে সচেতনতামূলক আরও কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।’
এ প্রসঙ্গে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) বদরুন নেসা বলেন, নারীর নিরাপত্তা রক্ষা, শিক্ষার মান উন্নয়ন ও স্বাস্থ্য রক্ষায় সরকার বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধেও সরকার বদ্ধপরিকর।

জাতীয় কন্যাশিশু দিবস আজ : আজ ৩০ সেপ্টেম্বর জাতীয় কন্যাশিশু দিবস। এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য ‘কন্যাশিশুর অগ্রযাত্রা, দেশের জন্য নতুন মাত্রা’। এবার কন্যাশিশুর অগ্রযাত্রায় অধিকার রক্ষা ও তাদের বিকাশের অন্তরায় দূর করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সংগঠন নানা আনুষ্ঠানিকতায় দিবসটি পালন করবে। সরকারের মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ২০০০ সালে দিবসটির অনুমোদন দেয়। এর আগে দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট ও ৫৪টি সংগঠন কন্যাশিশু দিবস পালন করার দাবি জানিয়ে আসছিল।

দিবসটি উপলক্ষে আজ সোমবার মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর এক আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণীর আয়োজন করেছে। অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এ সভায় সভাপতিত্ব করবেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) বদরুন নেসা। প্রধান অতিথি থাকবেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা। বিশেষ অতিথি থাকবেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব শেখ রফিকুল ইসলাম।

এছাড়া দিবসটি উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এদিকে কন্যাশিশুর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতি গুরুত্বারোপ ও তাদের প্রতি বৈষম্যহীন আচরণের বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির বিষয় সামনে রেখে আজ জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালন করা হলেও সরকারিভাবে দিবসটি পালিত হবে ১১ অক্টোবর। দিবসটি সামনে রেখে আজ মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে সকাল ১১টায় সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।